যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ গভর্নরের পদ থেকে লিসা কুককে সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বন্ধকী চুক্তিতে জালিয়াতির অভিযোগ এনে তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যা দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ১১১ বছরের ইতিহাসে প্রথম কোনো গভর্নরের সরাসরি বরখাস্তের ঘটনা।
সোমবার ট্রাম্প তার নিজস্ব সামাজিক মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ এক চিঠি প্রকাশ করে কুককে অপসারণের ঘোষণা দেন। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, মিজ কুক একই সময়ে দুটি ভিন্ন বাড়িকে তার “প্রধান বাসস্থান” হিসেবে দেখিয়ে বন্ধকী সুবিধা নিয়েছেন, যা “জালিয়াতিমূলক” এবং “বিশ্বাসযোগ্যতার ঘাটতির” পরিচায়ক। ট্রাম্প বলেন, “একই সময় দুইটি সম্পত্তিকে প্রধান বাসস্থান হিসেবে দাবি করা—এটা কোনোভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।”
লিসা কুক ছিলেন ফেডারেল রিজার্ভের বোর্ড অব গভর্নরসে নিযুক্ত প্রথম আফ্রিকান-আমেরিকান নারী। তাকে নিয়োগ দিয়েছিল সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন প্রশাসন ২০২২ সালে। তার অপসারণ শুধু একজন কর্মকর্তার অপসারণ নয়, বরং ফেডের স্বায়ত্তশাসনের ওপর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের নতুন দৃষ্টান্ত হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
অভিযোগ অস্বীকার করে লিসা কুক জানিয়েছেন, তিনি সামাজিক মাধ্যম থেকে বিষয়টি সম্পর্কে জেনেছেন এবং নিজেকে নির্দোষ মনে করেন। “ফেডারেল রিজার্ভে যোগদানের চার বছর আগেই ওই বন্ধকী ঋণটি নিয়েছিলাম। সামাজিক মাধ্যমের অভিযোগের ভিত্তিতে পদত্যাগ করার কোনো কারণ নেই,”—এক বিবৃতিতে বলেন কুক।
তিনি আরও জানান, বিষয়টি নিয়ে তিনি তদন্তে সহায়তা করবেন এবং প্রয়োজনীয় তথ্য জমা দেবেন। তবে তার বিরুদ্ধে অভিযোগে যদি আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তাহলে আইনি লড়াইয়েও যেতে প্রস্তুত বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন।
এই সিদ্ধান্ত কতটা সাংবিধানিক বা আইনসম্মত—তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। মার্কিন আইনে ফেডারেল রিজার্ভের গভর্নরদের নির্দিষ্ট মেয়াদ থাকে এবং তাদের অপসারণে “কার্যকর কারণ” দেখানো বাধ্যতামূলক। ট্রাম্প এই অপসারণের পেছনে “জালিয়াতির যথেষ্ট প্রমাণ” আছে দাবি করলেও, এখন পর্যন্ত কোনো আদালত কিংবা নিরপেক্ষ তদন্তে বিষয়টি প্রমাণিত হয়নি।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়াতে পারে এবং সেখানে ট্রাম্প প্রশাসনের এই পদক্ষেপের বৈধতা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
ফেডের সঙ্গে ট্রাম্পের বিরোধ নতুন নয়। সুদের হার কমাতে চাপ সৃষ্টি থেকে শুরু করে চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েলকে অপসারণের হুমকিও দিয়েছেন তিনি অতীতে। এবার লিসা কুককে সরিয়ে সেই সংঘাত নতুন মাত্রা পেল।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ফেড সুদের হার কমাতে রাজি না হওয়ায়, ট্রাম্প প্রশাসন স্পষ্টভাবে বিরক্তি প্রকাশ করে আসছিল। আর এই অপসারণের মাধ্যমে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ কায়েমের চেষ্টার অভিযোগ উঠছে হোয়াইট হাউসের বিরুদ্ধে।
লিসা কুককে অপসারণের ঘোষণা বাজারেও প্রভাব ফেলেছে। ডলার কিছুটা দুর্বল হয়েছে, সরকারি বন্ডের সুদের হার বেড়েছে এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ফেডারেল রিজার্ভের স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ হলে তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব মার্কিন অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
লিসা কুককে অপসারণের এই সিদ্ধান্ত শুধু একজন কর্মকর্তা নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা ও স্বচ্ছতার প্রশ্নে বড় এক ধাক্কা। এখন দেখার বিষয়, আইনি প্রক্রিয়া কীভাবে এগোয় এবং এটি ভবিষ্যতে ফেড-হোয়াইট হাউস সম্পর্ককে কোন পথে নিয়ে যায়।
