নিউইয়র্কে প্রথম মুসলিম মেয়র প্রার্থী হিসেবে ডেমোক্রেটিক মনোনয়নে এগিয়ে জোহরান

Media

নিউইয়র্ক সিটির মেয়র পদে ডেমোক্রেটিক পার্টির মনোনয়ন পাওয়ার দৌড়ে এগিয়ে থেকে ইতিহাস গড়েছেন ৩৩ বছর বয়সী জোহরান মামদানি, যিনি এই পদে প্রথম মুসলিম প্রার্থী হিসেবে সামনে এসেছেন।

প্রায় ৯৫ শতাংশ ভোট গণনার পর দেখা গেছে, মামদানি পেয়েছেন ৪৩ শতাংশ ভোট, যা তাকে সাবেক গভর্নর অ্যান্ড্রু কুওমোর চেয়ে এগিয়ে রেখেছে। কুওমো, যিনি ২০২১ সালে যৌন হয়রানির অভিযোগে পদত্যাগ করেন, এবার প্রাইমারিতে ৩৬ শতাংশ ভোট পেয়েছেন।

বামঘেঁষা নীতির এবং তৃণমূল পর্যায়ের দৃঢ় সংগঠনের ওপর ভর করে মামদানি এই সাফল্য অর্জন করেছেন। তার কথায়, “আজ আমরা ইতিহাস তৈরি করেছি। আমি নিউ ইয়র্ক সিটির মেয়র পদে ডেমোক্রেটিক পার্টির মনোনীত প্রার্থী হব।”

র‍্যাঙ্ক-চয়েস ভোটিং পদ্ধতির কারণে চূড়ান্ত ফলাফল কিছুটা পরিবর্তিত হতে পারে, তবে মামদানি যে এগিয়ে রয়েছেন তা স্পষ্ট।

এই প্রার্থীতা শুধু তার ব্যক্তিগত অগ্রগতি নয়, বরং নিউ ইয়র্ক শহরের রাজনীতির অভিমুখে এক নতুন ধারা সূচিত করছে, যা প্রগতিশীল শক্তির জন্য তাৎপর্যপূর্ণ বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

উগান্ডার কাম্পালায় জন্ম নেওয়া মামদানি সাত বছর বয়সে নিউ ইয়র্কে আসেন। তিনি ব্রঙ্কস হাই স্কুল অফ সায়েন্স এবং পরে বোওডেন কলেজে পড়াশোনা করেন, যেখানে আফ্রিকানা স্টাডিজে ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি ছিলেন "স্টুডেন্টস ফর জাস্টিস ইন প্যালেস্টাইন"-এর একজন সহ-প্রতিষ্ঠাতা।

প্রথম মুসলিম এবং দক্ষিণ এশীয় মেয়র হওয়ার পথে থাকা মামদানি তার পরিচয় এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে সামনে রেখে প্রচারণা চালিয়েছেন। তিনি উর্দু ভাষায় তৈরি ভিডিওতে বলিউড সিনেমার দৃশ্য ব্যবহার করেছেন এবং স্প্যানিশ ভাষায়ও প্রচারণা করেছেন।

তার স্ত্রী রামা দুয়াজি একজন সিরিয়ান শিল্পী। তাদের পরিচয় হয়েছিল ডেটিং অ্যাপ ‘হিঞ্জ’-এ। মামদানির মা হলেন খ্যাতনামা চলচ্চিত্র নির্মাতা মীরা নায়ার এবং বাবা মাহমুদ মামদানি কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক।

রাজনীতিতে আসার আগে মামদানি আবাসন খাতে কনসালট্যান্ট হিসেবে কাজ করতেন এবং কুইন্সে স্বল্প আয়ের বাসিন্দাদের উচ্ছেদ প্রতিরোধে কাজ করেছেন। নিজেকে একজন সংগঠক হিসেবে পরিচয় দেওয়া মামদানি বলেন, "বিশ্বের ঘটনাবলির সামনে আমি হতাশ নই, বরং সক্রিয় হই।"

তার নির্বাচনী অঙ্গীকারগুলো সাহসী ও ব্যতিক্রমী—

# শহরজুড়ে বিনামূল্যে বাস সেবা

# বাড়িভাড়া স্থিরকরণ এবং বাড়িওয়ালাদের জবাবদিহি

# সাশ্রয়ী দামে খাদ্য সরবরাহে শহর পরিচালিত মুদি দোকান

# শিশুদের জন্য সর্বজনীন চাইল্ড কেয়ার

# তিনগুণ বেশি সাশ্রয়ী আবাসন নির্মাণ

# মেয়রের অফিস পুনর্বিন্যাস এবং মালিকদের জবাবদিহির কাঠামো প্রতিষ্ঠা

তার প্রচারণা ভাইরাল হয়েছে একাধিক দৃষ্টান্তমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য— আটলান্টিক সাগরে ডুব দিয়ে বাসাভাড়ার সংকট তুলে ধরা, পাতাল রেলে বারিতো দিয়ে রোজা ভাঙা কিংবা ভোটের আগের দিন পুরো ম্যানহাটন হেঁটে ভোটারদের সঙ্গে দেখা করা।

তবে তার উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনাগুলো নিয়ে সমালোচনাও আছে। দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস এক সম্পাদকীয়তে বলেছে, মামদানি বাস্তবতার সঙ্গে কিছুটা বিচ্ছিন্ন অবস্থান নিচ্ছেন এবং তার প্রস্তাবগুলো শাসনের প্রয়োজনীয় সমঝোতার অভাব দেখায়।

তবুও, জোহরান মামদানি মনে করেন, নিউ ইয়র্ক শহরের সমস্যাগুলোর জন্য সাহসী এবং মানবিক নেতৃত্ব এখন জরুরি। তিনি বলেন, "এই শহরের চার ভাগের এক ভাগ মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করছে, পাঁচ লাখ শিশু প্রতিদিন না খেয়ে ঘুমাচ্ছে— এই বাস্তবতা পরিবর্তনযোগ্য।"

এখন প্রশ্ন, এই ইতিহাস সৃষ্টিকারী যাত্রা তাকে সিটি হল পর্যন্ত নিয়ে যাবে কি না, তা সময়ই বলবে।

তথ্য সূত্র: বিবিসি