বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল ও জনপ্রিয় ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান। মাঠের পারফরম্যান্সে তিনি যেমন বিশ্বসেরা, তেমনি ক্যারিয়ারজুড়ে বিতর্কও তার নিত্যসঙ্গী। সাম্প্রতিক সময়ে সেই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হওয়া সাকিব-আসিফের কথার লড়াই এখন জাতীয় রাজনীতি ও ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ আলোচনার অন্যতম গরম ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
সম্প্রতি এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে আসিফ মাহমুদ স্পষ্ট জানিয়ে দেন—সাকিব আল হাসানকে আর কখনও বাংলাদেশের জার্সি গায়ে দেখা যাবে না। তার বক্তব্য অনুযায়ী, সাকিব সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রকাশ্যে সমর্থন করেছেন, যিনি অভ্যুত্থান দমনে “মারণাস্ত্র ব্যবহারের” নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে আদালত রায়ে উল্লেখ করেছে।
শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি, মানি লন্ডারিং ও আর্থিক জালিয়াতিসহ একাধিক অভিযোগ সাকিবের বিরুদ্ধে রয়েছে।
“যার হাত ছাত্র-জনতার রক্তে রঞ্জিত, তাকে জাতীয় পতাকা বহনের সুযোগ দেওয়া যায় না”—এই ভাষাতেই নিজের অবস্থান তুলে ধরেন আসিফ।
ফেসবুকেও তিনি একাধিক পোস্ট দেন, যেখানে ইঙ্গিত করেন—বোর্ড ও সরকার বারবার সতর্ক করলেও সাকিব রাজনৈতিক অবস্থান পরিষ্কার করেননি।
সাকিবও চুপ থাকেননি। ফেসবুকে তিনি লিখেছেন, “শেষমেশ কেউ একজন স্বীকার করলেন, তাঁর জন্যই আমার আর বাংলাদেশের জার্সি গায়ে দেওয়া হলো না, দেশের হয়ে খেলতে পারলাম না।”
আরেক পোস্টে লিখেছেন, “ফিরব হয়তো কোনো দিন আপন মাতৃভূমিতে, ভালোবাসি বাংলাদেশ।”
তার এই প্রতিক্রিয়ায় স্পষ্ট বোঝা যায়, আসিফের বক্তব্যকে তিনি নিজের জাতীয় দল থেকে ছিটকে পড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানের সময় সাকিব কানাডায় ছিলেন। তখনই দেশে তুমুল আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনার পতন ঘটে।
সাকিব সেই সময় আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ছিলেন। এই রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা তাকে ঘিরে বিতর্ক বাড়ায়।
অভ্যুত্থানের পর তার বিরুদ্ধে হত্যা মামলা ও দুর্নীতির অভিযোগ গঠন হয়। এরপর শেখ হাসিনার জন্মদিনে ফেসবুকে শুভেচ্ছা জানানোর ঘটনায় ক্ষোভ আরও বেড়ে যায়।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) সরাসরি কোনো সিদ্ধান্ত না নিলেও বোর্ডের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন।
আসিফ মাহমুদের মন্তব্যকে এখনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা হিসেবে ধরা হয়নি। তবে বয়স ও প্রেক্ষাপট বিবেচনায় সাকিবের জাতীয় দলে ফেরার সম্ভাবনা কার্যত শেষ।
এদিকে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি মূলত রাজনৈতিক পরিস্থিতিরই প্রতিফলন। সাকিবের বিদায়ী টেস্টের অনিশ্চয়তা। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে সাকিব ঘোষণা করেছিলেন, দেশের মাটিতে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজ দিয়েই টেস্ট ক্যারিয়ার শেষ করবেন। কিন্তু নিরাপত্তা নিয়ে নিশ্চয়তা না পাওয়ায় সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।
শেষ পর্যন্ত ভারতের বিপক্ষে কানপুর টেস্টই তার ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচ হয়ে থাকে।
সেই সময়ই ধারণা করা হয়েছিল—সাকিবকে ঘরে শেষ টেস্ট খেলতে না দেওয়ার পেছনে সরকারের ভূমিকা রয়েছে। সাম্প্রতিক আসিফ মাহমুদের বক্তব্য সেই ধারণাকে আরও দৃঢ় করেছে।
আইসিসির ভূমিকা থাকবে কি?
ক্রীড়া সাংবাদিক এম এম কায়সার বিবিসি বাংলাকে বলেন, “যেভাবে ক্রীড়া উপদেষ্টা সরাসরি একজন ক্রিকেটারকে না খেলানোর ঘোষণা দিচ্ছেন তা ভালো উদাহরণ নয়। তবে আইসিসি এ নিয়ে সরাসরি কোনো পদক্ষেপ নেবে না।”
তার মতে, প্রতিটি ক্রিকেটারকে সংশ্লিষ্ট দেশের বোর্ডের নীতিমালা অনুযায়ী খেলতে হয়। সাকিব চাইলে আদালতে যেতে পারেন, কিন্তু আইসিসির এখতিয়ার সীমিত।
