ইসরায়েলের জরুরি চিকিৎসা সেবা সংস্থা ম্যাগেন ডেভিড অ্যাডম জানিয়েছে, ইরানের সাম্প্রতিক হামলায় এখন পর্যন্ত ১৭ জন মানুষ আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে তিনজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আহতদের মধ্যে রয়েছেন, একজন ১৬ বছর বয়সী কিশোর, যার শরীরের উপরের অংশে বোমার শারপনেল (বিস্ফোরকের টুকরো) বিদ্ধ হয়েছে।
একজন ৫৪ বছর বয়সী পুরুষ এবং ৪০ বছর বয়সী আরেকজন ব্যক্তি, যাদের দুজনেরই নিম্নাংশে (পা ও আশেপাশে) শারপনেলের আঘাত লেগেছে।
এছাড়াও আরও ১৪ জন ব্যক্তি সামান্যভাবে আহত হয়েছেন, তাদের সবার শরীরেও শারপনেলের চিহ্ন পাওয়া গেছে, তবে তারা গুরুতর নয়।
ইরান থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা ইসরায়েলের বিভিন্ন শহর ও স্থাপনায় আঘাত হানে। হামলার ফলে ছড়িয়ে পড়া শারপনেল বা ধ্বংসাবশেষে সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
ম্যাগেন ডেভিড অ্যাডম-এর মেডিকেল টিম দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আহতদের তাৎক্ষণিক চিকিৎসা দিচ্ছে এবং গুরুতরদের দ্রুত হাসপাতালে স্থানান্তর করা হচ্ছে। ইসরায়েলের বিভিন্ন হাসপাতাল ইতিমধ্যেই জরুরি ভিত্তিতে প্রস্তুতি নিয়ে কাজ করছে।
ইসরায়েলের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আশঙ্কা করছে, যদি হামলা এভাবে অব্যাহত থাকে, তাহলে আহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে এবং চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়তে পারে। জরুরি অবস্থা মোকাবিলায় অতিরিক্ত ডাক্তার ও নার্স মোতায়েন করা হয়েছে।
হামলাটি কোথা থেকে চালানো হয়েছে, বা কোন ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। তবে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ বিষয়টি তদন্ত করে দেখছে এবং দেশব্যাপী সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
এদিকে জেনেভাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মঞ্চে এই হামলা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মধ্যপ্রাচ্যে আরও এক দফা অস্থিরতার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে।
উল্লেখ্য, ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে উত্তেজনা আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। নানা প্রতিকূলতা ও পারস্পরিক অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের মধ্যেই এই হামলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ইসরায়েলের সঙ্গে উত্তেজনা কমাতে ইরানকে কূটনৈতিক প্রস্তাব দেবে ফ্রান্স
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনার মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে ফ্রান্স। জেনেভায় ইউরোপীয় কূটনীতিকদের সঙ্গে ইরানের আলোচনার প্রেক্ষাপটে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ঘোষণা করেছেন, ইরানকে একটি চার-দফা কূটনৈতিক প্রস্তাব দেওয়া হবে, যার লক্ষ্য হবে ইসরায়েলের সঙ্গে সামরিক সংঘাতের অবসান ঘটানো।
প্যারিসের উপকণ্ঠ লে বোর্গে-তে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ম্যাক্রোঁ বলেন,“ইরানকে এখন দেখাতে হবে যে তারা আলোচনার জন্য প্রস্তুত এবং আন্তরিক। আমরা সামরিক উত্তেজনার বদলে কূটনীতিকে অগ্রাধিকার দিতে চাই।”
তিনি আরও জানান, ফ্রান্স এই প্রস্তাব ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে সমন্বয় করে তৈরি করেছে এবং খুব শিগগিরই তা ইরানের কাছে উপস্থাপন করা হবে।
# চার-দফা কূটনৈতিক প্রস্তাবের মূল বিষয়বস্তু:
১. ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে নিয়ন্ত্রণ: জাতিসংঘের পরমাণু পর্যবেক্ষক সংস্থা IAEA-এর তত্ত্বাবধানে ইরান যেন আবারও ইউরেনিয়ামের সমৃদ্ধকরণ শূন্যের কাছাকাছি মাত্রায় ফিরিয়ে আনে।
২. ক্ষেপণাস্ত্র কার্যক্রমের তদারকি: ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির ওপর আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ আরোপ করে এ ধরনের প্রযুক্তির সীমিত উন্নয়ন নিশ্চিত করা।
৩. প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর অর্থায়ন বন্ধ: হিজবুল্লাহ, হামাস বা হুথি বিদ্রোহীদের মতো মধ্যপ্রাচ্যের প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর প্রতি ইরানের আর্থিক ও সামরিক সহায়তা বন্ধ করা।
৪. বিদেশি বন্দীদের মুক্তি: ইরানের কারাগারে আটক থাকা বিদেশি নাগরিকদের অবিলম্বে মুক্তি দিয়ে মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটানো।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও সম্ভাবনা
এই প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জার্মানি ও যুক্তরাজ্য ইতিমধ্যে ফ্রান্সের কূটনৈতিক তৎপরতার প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি ইরান এই প্রস্তাব গ্রহণ করে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে মধ্যপ্রাচ্যে একটি স্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
তবে ইরান এখনো এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে ইঙ্গিত মিলেছে, তারা প্রস্তাবটি "খোলামেলা ও কৌশলগত আলোচনার পর" বিবেচনা করবে।
সম্প্রতি ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে কয়েকটি পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটে, যার ফলে বহু হতাহতের পাশাপাশি আঞ্চলিক নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে। এই প্রেক্ষাপটেই ইউরোপীয় কূটনীতিকরা সক্রিয়ভাবে মধ্যস্থতায় এগিয়ে এসেছে।
ফ্রান্সের এই চার-দফা প্রস্তাব মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠার একটি সাহসী কূটনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, ইরান এই প্রস্তাব কতটা আন্তরিকতার সঙ্গে বিবেচনা করে এবং বিশ্বমঞ্চে কী ধরনের সাড়া পড়ে।
